ঢাকা, বাংলাদেশ || শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬
চিত্র বিচিত্র

ব্ল্যাকমেলের প্রতিশোধ: সাবেক প্রেমিকার ‘মৃত্যুফাঁদে’ প্রাণ গেল কলেজছাত্রের

প্রতিনিধি

শহিদুজজামান উজ্জ্বল:

৩০ মে, ২০২৬
ব্ল্যাকমেলের প্রতিশোধ: সাবেক প্রেমিকার ‘মৃত্যুফাঁদে’ প্রাণ গেল কলেজছাত্রের

ব্ল্যাকমেলের প্রতিশোধ: সাবেক প্রেমিকার ‘মৃত্যুফাঁদে’ প্রাণ গেল কলেজছাত্রের

প্রেম, বিচ্ছেদ এবং পরবর্তীতে গোপন ছবি-ভিডিও দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করার ভয়ানক এক প্রতিশোধের গল্প বেরিয়ে এসেছে পিবিআইয়ের এক তদন্তে। সাবেক প্রেমিকার পাতা নিখুঁত ‘মৃত্যুফাঁদে’ পা দিয়েই নির্মমভাবে খুন হতে হয়েছে ঢাকার একটি কলেজের শিক্ষার্থী ইসমাইল হোসেন ওরফে ইমনকে। মাদারীপুরের শিবচরে ২০২১ সালের ঈদুল ফিতরের দিনে ঘটে যাওয়া এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের আদ্যোপান্ত সম্প্রতি উঠে এসেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত একটি বিশেষ তদন্ত গ্রন্থে।

আড্ডার আড়ালে সাড়ে চার ঘণ্টার ‘মৃত্যুফাঁদ’

তদন্তের তথ্যমতে, ২০২১ সালের ১৩ মে ঈদের দিন বিকেলে শিবচরের একটি কলেজ মাঠে সহপাঠীদের আড্ডার আড়ালেই চূড়ান্ত রূপ পায় ইমনকে হত্যার নীলনকশা। প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ধাপে ধাপে সাজানো এই ‘ডেথ ট্র্যাপ’ বা মৃত্যুফাঁদ বাস্তবায়নে খুনিদের সময় লেগেছিল আনুমানিক সাড়ে চার ঘণ্টা।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, ঈদের দিন বেলা পৌনে চারটার দিকে ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী ডিগ্রি কলেজ মাঠে ইমনের সঙ্গে দেখা করেন তাঁর সাবেক প্রেমিকা ও আরেক তরুণী। এর আগেই পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী স্থানীয় একটি মোড় থেকে ছুরি এবং ঘুমের ওষুধ মেশানো কোমল পানীয় সংগ্রহ করে রেখেছিলেন ওই তরুণী। মাঠে আড্ডার একপর্যায়ে ইমনকে সেই চেতনানাশক মিশ্রিত পানীয় খাওয়ানো হয়। এরপর অচেতনপ্রায় ইমনকে অটোরিকশায় করে নিয়ে যাওয়া হয় আড়িয়াল খাঁ নদের পুরোনো ফেরিঘাট এলাকায়।

হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে যা ছিল-

গ্রেপ্তারের পর আদালতে দেওয়া মূল অভিযুক্ত তরুণীর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি থেকে জানা যায়, ইমনের সঙ্গে তাঁর পূর্বের প্রেমের সম্পর্কের কিছু ‘ঘনিষ্ঠ’ ছবি ও ভিডিও ইমনের কাছে সংরক্ষিত ছিল। পরবর্তীতে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর ওই তরুণীর অন্য জায়গায় বিয়ে ঠিক হলে ইমন আবার যোগাযোগ শুরু করেন। ছবি ও ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল ও দেখা করার চাপ দিতে থাকেন ইমন।

এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে এবং নিজের আসন্ন বিয়ে টিকিয়ে রাখতে ওই তরুণী তাঁর হবু স্বামী কামরুজ্জামান, চাচা তোবারক ফরাজী এবং আরেক বান্ধবীকে সঙ্গে নিয়ে ইমনকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেন।

নির্মম সেই মুহূর্ত-

নদীর পাড়ে বসে ছবি ও ভিডিও ডিলিট করার বিষয়ে ইমনের সঙ্গে তরুণীর বাগ্‌বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে ওই তরুণী আচমকা ছুরি বের করে ইমনের গলায় উপর্যুপরি আঘাত করেন। পরে তাঁর হবু স্বামী কামরুজ্জামান ছুরিটি কেড়ে নিয়ে ইমনের মৃত্যু নিশ্চিত করতে আরও আঘাত হানেন। এরপর দুজনে মিলে রক্তাক্ত দেহটি নদীতে ফেলে দিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। ঘটনার পরদিন ১৪ মে সন্ধ্যায় আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে ইমনের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

"এটি কোনো তাৎক্ষণিক ক্ষোভ বা আবেগতাড়িত হত্যাকাণ্ড ছিল না; বরং ঠান্ডা মাথায় নিখুঁত পরিকল্পনা করে ইমনকে ডেকে এনে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টন করা ছিল এবং সবাই অভিন্ন উদ্দেশ্য পূরণে কাজ করেছে।"

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পিবিআইয়ের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ও প্রধান মোস্তফা কামাল।

প্রাথমিকভাবে থানা পুলিশ মামলাটির তদন্ত শুরু করলেও পরবর্তীতে জট খুলতে দায়িত্ব দেওয়া হয় পিবিআইকে। প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ এবং নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে পিবিআই এই ‘ক্লুলেস’ মার্ডারের রহস্য উদ্ঘাটন করে এবং মূল পরিকল্পনাকারী তরুণীসহ আসামিদের আইনের আওতায় আনে।

শেয়ার করুন