নতুন বিধিমালায় উন্মুক্ত স্থানীয় নির্বাচন, প্রার্থী হতে পারবেন সব দলের যোগ্য ব্যক্তিরা
প্রতিনিধি
নিজস্ব প্রতিবেদক:

নতুন বিধিমালায় উন্মুক্ত স্থানীয় নির্বাচন, প্রার্থী হতে পারবেন সব দলের যোগ্য ব্যক্তিরা
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি জোরদার করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন আচরণবিধির খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে প্রণীত এই বিধিমালায় প্রার্থী হওয়ার আইনগত যোগ্যতা থাকলে যে কোনো ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন বলে জানিয়েছে কমিশন।
নতুন বিধিমালায় নিষিদ্ধ বা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই—এ মর্মে প্রার্থীদের কাছ থেকে আলাদা অঙ্গীকারনামা নেওয়ার প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত রাখা হয়নি। ফলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী কিংবা অন্য যে কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের ব্যক্তি, যদি আইনি যোগ্যতা পূরণ করেন, তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ, যিনি বিধিমালা প্রণয়ন কমিটির সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন, জানিয়েছেন যে আচরণবিধিতে কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীকে বাদ দেওয়ার বিধান রাখা হয়নি।
তিনি বলেন, “আমরা দেখব একজন প্রার্থী হওয়ার আইনগত যোগ্যতা রয়েছে কি না। তিনি কোন দল করেন, ধর্ম কী, নারী না পুরুষ—এসব বিষয় বিবেচ্য নয়। যোগ্যতা থাকলে যে কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।”
অঙ্গীকারনামার শর্ত বাদ
প্রাথমিক খসড়ায় প্রস্তাব ছিল, সম্ভাব্য প্রার্থীদের নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত একটি অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করতে হবে, যেখানে উল্লেখ থাকবে যে তারা নিষিদ্ধ বা নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তবে বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনার পর এ শর্ত বাদ দেওয়া হয়েছে।
এর পরিবর্তে প্রার্থীদের হলফনামায় কেবল নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলার অঙ্গীকার যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
নির্বাচনী বিধিমালায় যেসব পরিবর্তন আসছে
নতুন খসড়া অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে—
দলীয় প্রতীক ব্যবহার না করে নির্বাচন আয়োজন।
প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ বৃদ্ধি।
অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ না রাখা।
স্বতন্ত্র প্রার্থীর জন্য এক শতাংশ ভোটারের সমর্থন সংগ্রহের শর্ত বাতিল।
নির্বাচনী প্রচারণায় পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা।
ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার না করা।
ডাকযোগে বা পোস্টাল ব্যালটে ভোটদানের সুযোগ না রাখা।
ইসি জানিয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদের পর পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্যও একই ধরনের বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে।
আগস্টে ইউপি নির্বাচনের তফসিল
নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্ট মাসে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কার্যক্রমও এ নির্বাচনের মধ্য দিয়েই শুরু হবে।
খসড়া বিধিমালা রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের জন্য নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। এরপর রাজনৈতিক দল ও অংশীজনদের মতামত গ্রহণ করে তা আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে। সব প্রক্রিয়া শেষে বিধিমালা চূড়ান্ত করা হবে।
সরকারের অবস্থান
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সম্প্রতি সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন যেহেতু নির্দলীয় হবে, তাই শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।
তার ভাষায়, “একজন ব্যক্তি আওয়ামী লীগের সমর্থক হলেও যদি নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন, তাহলে তিনি অংশ নিতে পারবেন। কারণ স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হচ্ছে না।”
আওয়ামী লীগের প্রস্তুতি
দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেছেন, দলের সভাপতি শেখ হাসিনা নেতা-কর্মীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন। কর্মী-সমর্থকদের মধ্য থেকে সম্ভাব্য প্রার্থী নির্ধারণ এবং সমমনা রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও তিনি জানান।
একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
ভোটের সমীকরণে পরিবর্তনের সম্ভাবনা
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগপন্থী প্রার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হলে ভোটের হিসাব-নিকাশে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম মনে করেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থক ভোটাররা নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেই ভোটাররা আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ প্রার্থীদের সমর্থন করতে পারেন।
তার মতে, “বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন কাগজে-কলমে নির্দলীয় হলেও বাস্তবে তা প্রায়ই দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নেয়। আওয়ামী লীগপন্থী প্রার্থীরা অংশ নিতে পারলে নির্বাচনের ফলাফলে তার প্রভাব পড়তে পারে এবং দলটির জন্য এটি রাজনৈতিকভাবে পুনরায় সক্রিয় হওয়ার একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে।”
পটভূমি
বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে ২০১৫ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার স্থানীয় সরকার আইন সংশোধন করে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন চালু করে।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত চারটি পৃথক অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এসব অধ্যাদেশের মাধ্যমে দলীয় প্রতীক ও দলীয় মনোনয়নের বিধান বাতিল করা হয়। পরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে একই ব্যবস্থা বহাল রেখে আইন পাস হয়, যার ভিত্তিতে এখন নতুন নির্বাচনী বিধিমালা প্রণয়ন করছে নির্বাচন কমিশন।
নতুন ব্যবস্থায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন আবারও নির্দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যেখানে প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে তার আইনগত যোগ্যতাকেই প্রধান বিবেচনা করা হবে।
