ঢাকা, বাংলাদেশ || রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬
সারাদেশ

বেনাপোলে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রোটনের মরদেহ হস্তান্তর

প্রতিনিধি

শহিদুজ্জামান উজ্জল :

বেনাপোলে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রোটনের মরদেহ হস্তান্তর

বেনাপোলে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রোটনের মরদেহ হস্তান্তর

নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটনের মরদেহ ভারত থেকে বাংলাদেশে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।

রবিবার (১১ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ভারতের পেট্রাপোল সীমান্ত হয়ে রোটনের মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স বেনাপোল চেকপোস্টে পৌঁছে। পরে ইমিগ্রেশনের প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে শূন্যরেখায় আনুষ্ঠানিকভাবে মরদেহটি বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

মরদেহ হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে বেনাপোল চেকপোস্ট এলাকায় আগে থেকেই নেওয়া হয় ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা। শনিবার গভীর রাত থেকে রবিবার দুপুর পর্যন্ত চেকপোস্ট সড়ক ও আশপাশের এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়ন। যশোর থেকেও অতিরিক্ত বিশেষ সৈনিক মোতায়েন করা হয়। মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স সীমান্ত এলাকা ত্যাগ না করা পর্যন্ত সাধারণ মানুষের প্রবেশে বিধিনিষেধ জারি ছিল।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শনিবার দিবাগত রাত দেড়টার পর থেকেই বেনাপোল চেকপোস্ট সড়কে দফায় দফায় নিরাপত্তা মহড়া ও নজরদারি বাড়ানো হয়। সীমান্ত এলাকায় প্রবেশের বিভিন্ন পথে বিজিবির সদস্যরা অবস্থান নেন। রবিবার সকাল ৯টার পর নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়। এ সময় কাস্টমস, বন্দর, ব্যাংক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাংবাদিকদেরও চেকপোস্ট এলাকায় প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ফলে স্বাভাবিক যাতায়াত, রোগী পরিবহনসহ বিভিন্ন অফিসিয়াল কার্যক্রমে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রায় ছয় ঘণ্টার মতো সময় ধরে চেকপোস্ট এলাকায় স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। বিশেষ করে বেনাপোল স্থলবন্দর, কাস্টমস, সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসা ও ব্যাংকিং কার্যক্রমে এর প্রভাব পড়ে। একমাত্র পাসপোর্ট যাত্রী ছাড়া কাউকে নিরাপত্তাবেষ্টনী অতিক্রম করতে দেওয়া হয়নি।

যশোর ৪৯ বিজিবি সূত্রে জানা যায়, উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় সীমান্তে কোনও ধরনের নাশকতা এড়াতে নিñিদ্র নিরাপত্তাবেষ্টনীর বলয় তৈরি করা হয়। মরদেহবাহী এ্যাম্বুলেন্স সীমান্ত ত্যাগ না করা পর্যন্ত একমাত্র পাসপোর্টধারী ব্যক্তি ব্যতিত সকল ধরণের যানবাহন ও মানুষের যাতায়াত বন্ধ রাখা হয়।

রোটনের মরদেহ ১১ অক্টোবর ভোর সাড়ে ৩টার দিকে কলকাতা থেকে পেট্রাপোল সীমান্তের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা হয়। মরদেহ সীমান্তে পৌঁছানোর পর যাতে দ্রুত ছাড়পত্র ও হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়, সে জন্য ভারতীয় অংশেও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়। একইভাবে বাংলাদেশ অংশে মরদেহ গ্রহণের জন্য স্বজন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভোরেই বেনাপোল চেকপোস্টে উপস্থিত থাকার ব্যবস্থা করা হয়।

সকাল ১০টার দিকে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি ভারতের হরিদাসপুর-পেট্রাপোল চেকপোস্ট হয়ে বেনাপোলের দিকে আসে। প্রয়োজনীয় ইমিগ্রেশন ও কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর শূন্যরেখায় মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। পরে বেনাপোল চেকপোস্ট ইমিগ্রেশনের প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই-বাছাই ও আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

বেনাপোল চেকপোস্ট ইমিগ্রেশন পুলিশের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুর রহমান খান জানান, মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি বাংলাদেশ সীমান্তে প্রবেশ করলে প্রয়োজনীয় ইমিগ্রেশন ও কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। পরে অ্যাম্বুলেন্সটি দ্রুত গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘদিন ফুসফুসের ক্যানসারে ভুগছিলেন তিনি। চিকিৎসার জন্য দুই বছরের বেশি সময় ধরে ভারতে অবস্থান করছিলেন।

শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে কলকাতার অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৪৮ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে কয়েক দিন আগে তাঁকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘদিন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কলকাতায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সাবেক নেতাকর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। পরে তাঁর মরদেহ দেশে এনে ঢাকায় নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ জন্য বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগও করা হয়।

চট্টগ্রামের রাউজানের সন্তান মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। ছাত্রলীগের রাজনীতির মধ্য দিয়ে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিতি লাভ করেন। ২০০৬ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ওই কমিটির সভাপতি ছিলেন মাহমুদ হাসান রিপন।

ছাত্রলীগের রাজনীতি শেষ করে তিনি আওয়ামী লীগের মূল রাজনীতিতেও সক্রিয় হন। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৬ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। ২০২১ সালে আওয়ামী লীগের শ্রম ও জনশক্তিবিষয়ক উপকমিটির সদস্য হিসেবেও মনোনীত হন।

এদিকে, রোটনের মরদেহ দেশে আনার বিষয়টি ঘিরে বেনাপোল সীমান্তে নেওয়া নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং দীর্ঘ সময়ের বিধিনিষেধে স্থানীয় ব্যবসায়ী, বন্দর ব্যবহারকারী, যাত্রী, সিঅ্যান্ডএফ কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়। তবে মরদেহ হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর ধীরে ধীরে সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

শেয়ার করুন