ঢাকা, বাংলাদেশ || মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়

র‍্যাব বিলুপ্ত, পুলিশের অধীনে এসআরবি গঠনের অনুমোদন

প্রতিনিধি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

১৭ আগস্ট, ২০২৬
র‍্যাব বিলুপ্ত, পুলিশের অধীনে এসআরবি গঠনের অনুমোদন

র‍্যাব বিলুপ্ত, পুলিশের অধীনে এসআরবি গঠনের অনুমোদন

এলিট ফোর্স র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে প্রস্তাবিত ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

সোমবার (১৭ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপিত প্রস্তাবটি অনুমোদন করা হয়। পরে রাতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

মন্ত্রিসভার অনুমোদিত খসড়াটি এখন লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের ভেটিংয়ের মধ্য দিয়ে যাবে। ভেটিং শেষ হলে এটি জাতীয় সংসদে বিল আকারে উত্থাপন করা হবে। সংসদে বিলটি পাস হয়ে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পেলে তা আইনে পরিণত হবে।

প্রস্তাবিত আইনের মাধ্যমে বর্তমান র‍্যাব বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোর অধীনে এসআরবি প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। নতুন এই ইউনিটকে বিশেষায়িত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি এর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পৃথক আইনি কাঠামো নির্ধারণ করা হবে।

খসড়া আইনে নাগরিকদের অভিযোগ এবং এসআরবির সদস্যদের অভ্যন্তরীণ সংক্ষোভ বা অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একটি বহুপক্ষীয় অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে ইউনিটটির কার্যক্রমে জবাবদিহি ও অভিযোগ নিষ্পত্তির একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া র‍্যাবের বর্তমান জনবল, বিভিন্ন আদেশ, ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব, সুযোগ-সুবিধা, তহবিল, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, হিসাব, নথিপত্র, রেকর্ডসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সম্পদ এসআরবির কাছে হস্তান্তরের বিধান রাখা হয়েছে। ফলে র‍্যাবের বিদ্যমান সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর একটি বড় অংশ নতুন ইউনিটের অধীনে যাওয়ার সুযোগ থাকবে।

খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, এসআরবির জন্য নতুন বিধিমালা প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত র‍্যাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিদ্যমান বিভাগীয় কার্যধারার বিধিমালা প্রয়োজনীয় অভিযোজনসহ কার্যকর থাকবে। এতে রূপান্তরকালীন সময়ে প্রশাসনিক ও বিভাগীয় কার্যক্রম পরিচালনায় আইনি শূন্যতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি কমবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রস্তাবিত আইনের খসড়া অনুযায়ী, অন্য কোনো আইনে ভিন্ন কিছু থাকলেও এসআরবির একজন কর্মকর্তা তল্লাশি, আটক, জব্দকরণ ও গ্রেফতারের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী তদন্তকারী কর্মকর্তার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। অর্থাৎ নতুন ইউনিটের সদস্যদের আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ক্ষমতা আইনের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।

২০০৪ সালে তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে পুলিশের বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে র‍্যাব প্রতিষ্ঠা করা হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, সন্ত্রাস ও মাদকবিরোধী অভিযানসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনে দ্রুত অভিযান পরিচালনার জন্য বাহিনীটি গঠন করা হয়েছিল।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই র‍্যাবের বিভিন্ন অভিযান নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। বিশেষ করে কথিত ‘ক্রসফায়ার’ বা বন্দুকযুদ্ধের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে দেশ-বিদেশে আলোচিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এসব অভিযোগ আরও ব্যাপকভাবে সামনে আসে।

২০১৮ সালে কক্সবাজারে কথিত বন্দুকযুদ্ধে পৌর কাউন্সিলর ও ব্যবসায়ী একরামুল হক নিহত হওয়ার ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ওই ঘটনার পর র‍্যাবের কার্যক্রম নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে সমালোচনা শুরু হয়।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র র‍্যাব এবং বাহিনীটির কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর র‍্যাবের সংস্কার ও জবাবদিহি নিয়ে বাংলাদেশে এবং আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা আরও জোরালো হয়।

শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতা হারানোর পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংস্কার নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির নেতৃত্বাধীন তৎকালীন পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিটি আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাব বিলুপ্ত করার দাবি জানায়।

এরপর র‍্যাবের পরিবর্তে নতুন কাঠামোর বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের বিষয়টি আলোচনায় আসে। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর এবার এসআরবি আইন, ২০২৬-এর খসড়ায় মন্ত্রিসভার অনুমোদনের মধ্য দিয়ে সেই উদ্যোগ আইনি কাঠামো পাওয়ার পথে এগোল।

তবে র‍্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে জাতীয় সংসদে বিল পাসসহ আরও কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হবে। ফলে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পরই র‍্যাবের কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না; আইন কার্যকর হওয়ার পর নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় রূপান্তর সম্পন্ন হবে।

শেয়ার করুন