ঢাকা, বাংলাদেশ || বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬
জাতীয়

নিউমার্কেটে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ টিটনকে, কাছ থেকে গুলি করে হত্যা

প্রতিনিধি

সীমান্তের খবর ডেস্ক:

২৯ এপ্রিল, ২০২৬
নিউমার্কেটে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ টিটনকে, কাছ থেকে গুলি করে হত্যা

রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় প্রকাশ্যে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নঈম আহমেদ টিটনকে (৫৮)।

রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় প্রকাশ্যে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নঈম আহমেদ টিটনকে (৫৮)। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাত ৮টার দিকে শাহ নেওয়াজ ছাত্রাবাসের বটতলা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। হত্যাকাণ্ডের ধরন, টার্গেট করে গুলি এবং পালানোর কৌশল-সব মিলিয়ে এটি পরিকল্পিত ‘এক্সিকিউশন স্টাইল’ হামলা বলে মনে করছে পুলিশ।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, টিটন দ্রুত হেঁটে যাওয়ার সময় পেছন থেকে মাস্ক পরিহিত এক যুবক প্রথমে তাকে লক্ষ্য করে দুই রাউন্ড গুলি করে। এতে তিনি দিশেহারা হয়ে পড়লে হামলাকারী দৌড়ে কাছে গিয়ে আরও কয়েক রাউন্ড গুলি চালায়। একপর্যায়ে সামনে গিয়ে মাথায় ঠেকিয়ে গুলি করে তাকে নিশ্চিতভাবে হত্যা করা হয়। এরপর আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য একটি ফাঁকা গুলি ছুড়ে দ্রুত একটি মোটরসাইকেলের পেছনে উঠে পালিয়ে যায় হামলাকারী।

গুলিবিদ্ধ অবস্থায় স্থানীয়রা টিটনকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রাত ৮টা ২৭ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মোঃ ফারুক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদ আলম জানান, নিহত টিটন রাজধানীর পুরনো তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একজন। তাকে লক্ষ্য করেই এ হামলা চালানো হয়েছে এবং এর পেছনে আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব কাজ করেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, টিটন ২০০১ সালে ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় ছিলেন। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে তিনি ঢাকার অপরাধ জগতে প্রবেশ করেন এবং ধীরে ধীরে ধানমন্ডি, হাজারীবাগ ও রায়েরবাজার এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেন। একাধিক হত্যা, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ২০০৪ সালে তাকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০১৪ সালে বাবর এলাহী হত্যা মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড হয়।

দীর্ঘ কারাভোগের পর ২০২৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তিনি জামিন পান, তবে তাৎক্ষণিক মুক্তি পাননি। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি কারামুক্ত হন। মুক্তির পর আদালতে নিয়মিত হাজিরা না দেওয়ায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি হয় এবং তিনি পলাতক ছিলেন। এ সময় আবারও নিউমার্কেট, হাজারীবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টিটনের পারিবারিক ও অপরাধ জগতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ ছিল শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন ওরফে ইমনের সঙ্গে। ইমন টিটনের ছোট বোন নীলাকে বিয়ে করেন-সে সূত্রে তারা ভগ্নিপতি-শ্যালক। একসময় দুজনই মোহাম্মদপুরভিত্তিক ‘হারিছ-জোসেফ’ গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত থেকে পুরান ঢাকার অপরাধ জগতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেন।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্কের অবনতি ঘটে। দীর্ঘ কারাভোগের পর ২০২৪ সালের পর দুজনই আবার সক্রিয় হলে আধিপত্য ও অর্থের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বিরোধ শুরু হয়। ইমন দেশ ছেড়ে বিদেশে অবস্থান করলেও সেখান থেকেই একটি বড় অপরাধী নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, সেই দ্বন্দ্বই শেষ পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী রূপ নিয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্র আরও জানায়, এর আগে ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাঈফ মামুনকে। ওই হত্যার নেপথ্যেও ইমন-টিটন সংশ্লিষ্ট চক্রের দ্বন্দ্বের বিষয়টি উঠে আসে।

টিটনের গ্রামের বাড়ি যশোর শহরের কারবালা এলাকায়। স্থানীয় সূত্র জানায়, যশোরে একাধিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পর তিনি ঢাকায় গিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডে প্রতিষ্ঠা পান এবং ধীরে ধীরে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালানো হচ্ছে। নিউমার্কেট থানার এসআই শাহাদাত বলেন, ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা নেওয়া হবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, টিটন হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

শেয়ার করুন