ঢাকা, বাংলাদেশ || বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬
সারাদেশ

ঝিকরগাছায় মা-শিশুর রহস্যজনক মৃত্যু: ‘আত্মহত্যা নয়, হত্যা’-অভিযোগ নিহতের পরিবারের

প্রতিনিধি

শহিদুজজামান উজ্জ্বল:

৯ জুন, ২০২৬
ঝিকরগাছায় মা-শিশুর রহস্যজনক মৃত্যু: ‘আত্মহত্যা নয়, হত্যা’-অভিযোগ নিহতের পরিবারের

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার নাভারণ ইউনিয়নের শরিফপুর গ্রামে দেড় বছর বয়সী শিশুপুত্রসহ এক গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় রহস্য ঘনীভূত হয়েছে।

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার নাভারণ ইউনিয়নের শরিফপুর গ্রামে দেড় বছর বয়সী শিশুপুত্রসহ এক গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় রহস্য ঘনীভূত হয়েছে।

পুলিশের প্রাথমিক ধারণা আত্মহত্যা হলেও নিহতের পরিবারের দাবি, এটি আত্মহত্যা নয়, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন তারা।

মঙ্গলবার (৯ জুন) সকালে শরিফপুর গ্রামের একটি ঘর থেকে গৃহবধূ রেবেকা খাতুন (২৬) এবং তার দেড় বছর বয়সী ছেলে সোহরাব হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করে ঝিকরগাছা থানা পুলিশ।

এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রেবেকার স্বামী জনি মিয়া (৩০)-কে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।

নিহত রেবেকার বাবার বাড়ি যশোরের শার্শা উপজেলার লক্ষণপুর ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামে।

প্রায় এক যুগ আগে শরিফপুর গ্রামের জনি মিয়ার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তাদের সংসারে দুই সন্তান রয়েছে। বড় মেয়ে জুঁই খাতুন (১০) স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ঘটনার সময় সে স্কুলে থাকায় প্রাণে বেঁচে যায়।

মৃত্যুর খবর পেয়ে তার বাপের বাড়ির লোকজন ছুটে আসেন।

নিহতের বোন শাফিহা খাতুন, ভাবি সাবিহা বেগম ও খালাতো ভাই রবিউল ইসলামের দাবি রেবেকাকে তার স্বামী হত্যা করেছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিহতের বোন শাফিয়া খাতুন বলেন, ‘আমার বোনকে নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়েছে’

“আমার বোন কখনও নিজের সন্তানকে নিয়ে আত্মহত্যা করতে পারে না। দীর্ঘদিন ধরে তার স্বামী জনি মাদক খেয়ে তাকে মারধর করতো। বিভিন্ন সময় টাকার জন্য চাপ দিত। আমরা বিশ্বাস করি, আমার বোন ও ভাগ্নেকে হত্যা করা হয়েছে।”

নিহতের ভাবি সাবিহা বেগম অভিযোগ করেন, “বিয়ের পর থেকেই রেবেকার সংসারে অশান্তি ছিল। জনি কোনো কাজকর্ম করতো না। ইয়াবা সেবন করতো এবং প্রায়ই টাকার জন্য রেবেকাকে চাপ দিত। নির্যাতনের বিষয়টি রেবেকা আমাদের একাধিকবার জানিয়েছে।”

নিহতের খালাতো ভাই রবিউল ইসলাম বলেন, “রেবেকার বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে তার অংশের প্রায় দেড় বিঘা জমি বিক্রি করা হয়েছিল। সেই টাকার বড় অংশ প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা জনি নষ্ট করেছে। এরপর আরও জমি বিক্রি করে টাকা আনার জন্য রেবেকার ওপর চাপ সৃষ্টি করতো। এ নিয়ে প্রায়ই তাদের মধ্যে ঝগড়া হতো।”

স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, রেবেকার পৈত্রিক সম্পত্তির অংশ হিসেবে পাওয়া জমি বিক্রি করে কয়েক দফায় মোটা অঙ্কের টাকা জনির হাতে যায়। কিন্তু সেই টাকা বিভিন্নভাবে খরচ হয়ে যাওয়ার পর আরও অর্থের জন্য স্ত্রীকে চাপ দিচ্ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিবেশীদের কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জনি মিয়ার বিরুদ্ধে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদকসেবনের অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই বিরোধ হতো।

এক প্রতিবেশী বলেন, “সংসারে শান্তি ছিল না। টাকার বিষয় নিয়ে প্রায়ই ঝামেলা হতো। আমরা অনেক সময় ঝগড়ার শব্দ শুনেছি।”

আত্মহত্যা নাকি হত্যা? ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ একই ঘরে মা ও শিশুর মরদেহ পাওয়া গেছে। নিহতের পরিবারের দাবি, প্রথমে শিশুটিকে হত্যা করা হয় এবং পরে ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

তবে এ বিষয়ে এখনই নিশ্চিত কোনো মন্তব্য করতে রাজি নয় পুলিশ।

পুলিশের বক্তব্যে ঝিকরগাছা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) গোলাম কিবরিয়া বলেন, “মা ও শিশুর মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য যশোর জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এটি আত্মহত্যা বলে মনে হলেও তদন্তের আগে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাবে না। নিহতের স্বামীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্তের ভিত্তিতে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা হবে।”

এদিকে, একসঙ্গে মা ও শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় শরিফপুর গ্রামজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয়দের অনেকেই ঘটনাটিকে রহস্যজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তারা দ্রুত, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।

অপরদিকে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং পুলিশের তদন্তের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে নিহত রেবেকার পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

তাদের প্রশ্ন একটাই-এটি কি সত্যিই আত্মহত্যা, নাকি মা ও শিশুকে হত্যা করে ঘটনাটি অন্য খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়েছে? তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেই প্রশ্নের উত্তর মিলছে না।

শেয়ার করুন