বেনাপোল বন্দরের সিসিটিভিতে ধরা পড়ল ৪০ প্যাকেট সরানোর দৃশ্য # আনসার সদস্য, নিরাপত্তাকর্মী, ট্রাকচালক-হেলপার ও কাস্টমস কর্মকর্তাসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা
প্রতিনিধি
কামাল হোসেন:

বেনাপোল বন্দরের সিসিটিভিতে ধরা পড়ল ৪০ প্যাকেট সরানোর দৃশ্য # আনসার সদস্য, নিরাপত্তাকর্মী, ট্রাকচালক-হেলপার ও কাস্টমস কর্মকর্তাসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা
দেশের সর্ববৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে ভারত থেকে আমদানিকৃত একটি পণ্যচালান থেকে সংঘবদ্ধভাবে বিপুল পরিমাণ পণ্য আত্মসাতের ঘটনায় আনসার সদস্য, বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী, ট্রাকচালক-হেলপার এবং দায়িত্বরত কাস্টমস কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে ভুয়া এন্ট্রি পাস ব্যবহার, নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন এবং দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের যোগসাজশে বন্দরের অভ্যন্তর থেকেই ৪০টি প্যাকেট অন্য একটি ট্রাকে সরিয়ে নেওয়ার প্রমাণ মিলেছে।
শনিবার (২৭ জুন) বেনাপোল পোর্ট থানায় বেনাপোল স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) মোঃ ওবাইদুল মিয়া বাদী হয়ে দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪০৯, ৪২০, ৪৬৫ ও ৩৪ ধারায় মামলাটি দায়ের করেন। মামলার নম্বর-২৮।
মামলার আসামিরা হলেন-আনসার সদস্য আমিরুল ইসলাম, জিল্লুর রহমান ও রসুল ফকির; বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী রাতুল, রাজু আহমেদ, নুরুল হুদা ও আসাদুল; ট্রাকচালক ইব্রাহীম খলিল, হেলপার সালাম হোসেন এবং বন্দরের ছোট আঁচড়া বাঁশকল গেটে দায়িত্বরত অজ্ঞাতনামা কাস্টমস কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নিরাপত্তাকর্মীসহ আরও কয়েকজন।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২৩ জুন ভারতের ডব্লিউবি-২৫কে-৮৪১৫ নম্বরের একটি ট্রাক ঘোষণাপত্র অনুযায়ী ১০ হাজার ৯০ কেজি সরিষার খৈল নিয়ে বেনাপোল বন্দরে প্রবেশ করে। দুই দিন কার্গো ভেহিকেল টার্মিনালে থাকার পর ২৫ জুন একটি ভুয়া এন্ট্রি পাস ব্যবহার করে ট্রাকটি কেমিক্যাল জোনে প্রবেশ করে।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ওই দিন দুপুর ১টা ৩৯ মিনিটে ঢাকা মেট্রো-ট-২২-২১৭৮ নম্বরের একটি বাংলাদেশি ট্রাক ভারতীয় ট্রাকটির পাশে এসে দাঁড়ায়। পরে বন্দর, কাস্টমস কিংবা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রতিনিধির উপস্থিতি ছাড়াই ভারতীয় ট্রাক থেকে ৪০টি প্যাকেট বাংলাদেশি ট্রাকে তোলা হয়। কিছুক্ষণ পর দুটি ট্রাকই একই গেট দিয়ে নির্বিঘ্নে বন্দর ত্যাগ করে।
পরে কাস্টমসের ইনভেন্টরিতে ভারতীয় ট্রাকে ১৪০টি প্যাকেট ও ৫০টি খালি বস্তা পাওয়া যায়। মোট ওজন হয় ৭ হাজার ১৫৬ কেজি। অথচ বন্দরের ওয়েব্রিজে ট্রাকটির ওজন রেকর্ড ছিল ৯ হাজার ৯৪০ কেজি। অর্থাৎ ২ হাজার ৭৮৪ কেজি পণ্যের গরমিল ধরা পড়ে।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, দায়িত্বরত আনসার সদস্য ও নিরাপত্তাকর্মীরা কোনো পর্যায়েই এন্ট্রি পাস, গেট পাস কিংবা চালানপত্র যাচাই করেননি। এমনকি প্রকাশ্যে পণ্য স্থানান্তরের সময়ও তারা কোনো বাধা দেননি। বন্দর কর্তৃপক্ষের ধারণা, ঘোষণাপত্রে সরিষার খৈল উল্লেখ থাকলেও সরিয়ে নেওয়া ৪০টি প্যাকেটে উচ্চমূল্যের ঘোষণাবহির্ভূত অন্য কোনো পণ্য ছিল।
ঘটনার পর ২৫ জুন রাত থেকে ২৬ জুন গভীর রাত পর্যন্ত বন্দর কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে। পরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বেনাপোল পৌর গেটসংলগ্ন একটি ফিলিং স্টেশন থেকে বাংলাদেশি ট্রাকটি শনাক্ত করা হয়। ট্রাকচালক ইব্রাহীম খলিল ও হেলপার সালাম হোসেন জিজ্ঞাসাবাদে বন্দর থেকে পণ্য নিয়ে ঢাকায় যাওয়ার কথা স্বীকার করলেও কার নির্দেশে বা কার মাধ্যমে পণ্য পরিবহন করেছেন, সে বিষয়ে তদন্ত চলছে।
বেনাপোল পোর্ট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আশরাফ হোসেন মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামিকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
তবে, একের পর এক ঘটনায় প্রশ্নের মুখে পড়েছে বন্দর-কাস্টমসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। গত কয়েক সপ্তাহে বেনাপোল বন্দর ও কাস্টমসকে ঘিরে একের পর এক পণ্য লোপাট, ঘোষণা বহির্ভূত পণ্য উদ্ধার, শুল্ক ফাঁকি এবং দায়িত্বে অবহেলার ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি ঘটনায় মামলা হয়েছে, সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন কাস্টম ও বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা, স্থগিত হয়েছে একাধিক সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের লাইসেন্স। তবু থামছে না অনিয়মের অভিযোগ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক সিসিটিভি, একাধিক নিরাপত্তা স্তর এবং কাস্টমস-বন্দর-পুলিশের সমন্বিত নজরদারির মধ্যেও যদি বন্দরের অভ্যন্তরে ভুয়া এন্ট্রি পাস ব্যবহার করে প্রকাশ্যে পণ্য সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
রাজস্ব সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত হোতাদের আইনের আওতায় আনা না গেলে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ঝুঁকির মুখে পড়বে। একই সঙ্গে দেশের প্রধান স্থলবন্দরের ভাবমূর্তি ও ব্যবসায়ীদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বন্দর সংশ্লিষ্ঠরা বলেন, একের পর এক মামলা, সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা সত্ত্বেও যদি একই ধরনের অনিয়ম অব্যাহত থাকে, তবে এর নেপথ্যে থাকা মূল চক্র কারা? তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা কবে নেওয়া হবে-সেই উত্তর এখন শুধু বন্দর ব্যবহারকারী নয়, গোটা এলাকার ব্যবসায়ী মহলও জানতে চায়।
