ঢাকা, বাংলাদেশ || বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬
সারাদেশ

শার্শায় সালিশের নামে বৃদ্ধকে জিম্মি করে ৩ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ

প্রতিনিধি

কামাল হোসেন:

২৩ জুলাই, ২০২৬
শার্শায় সালিশের নামে বৃদ্ধকে জিম্মি করে ৩ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ

শার্শায় সালিশের নামে বৃদ্ধকে জিম্মি করে ৩ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ

যশোরের শার্শা উপজেলায় পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ৮০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধকে জিম্মি করে সালিশি বিচারের নামে অন্যায়ভাবে ৩ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী বৃদ্ধ নিজের শেষ সম্বল ৭ কাঠা জমি বিক্রি করে এই টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানা গেছে।

এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও তদন্তের দাবি জানিয়ে যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বরাবর লিখিত আবেদন করেছেন ভুক্তভোগী।

লিখিত অভিযোগ ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ জুন (শুক্রবার) সকাল আনুমানিক ১০টায় শার্শা উপজেলার গোগা ইউনিয়নের পাঁচ ভূলাট গ্রামের বৃদ্ধ গোলাম হোসেনের বাড়িতে একই গ্রামের আব্দুর রহমানের স্ত্রী সাথী খাতুন (২২) পান খাওয়ার কথা বলে প্রবেশ করেন।

অভিযোগকারীর দাবি, এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত ঘটনা। সাথী খাতুন ঘরে ঢোকার কিছুক্ষণ পরেই কতিপয় ব্যক্তি জোরপূর্বক ঘরে ঢুকে গোলাম হোসেনকে আটকে ফেলে এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। পরবর্তীতে ওই দিন সন্ধ্যায় স্থানীয় গোগা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ আলী ও তাঁর সহযোগীদের উপস্থিতিতে সালিশে বসার হুমকি দেওয়া হয়।

সন্ধ্যায় বৃদ্ধকে স্থানীয় ‘আনসার হুজুর’-এর বাসায় নেওয়া হয়। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, কোনো ধরনের নিরপেক্ষ তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ বা তাঁর নিজ বক্তব্য শোনার সুযোগ না দিয়েই প্রথমে ৬ লাখ টাকা জরিমানা ধার্য করা হয়। পরে তা কমিয়ে ৩ লাখ টাকা নির্ধারণ করে ১৫ দিনের মধ্যে পরিশোধের আলটিমেটাম দেওয়া হয়।

সালিশে জামিনদার হিসেবে মধ্যস্থতা করেন ভুক্তভোগী বৃদ্ধের ছোট ভাই মোঃ এরশাদ আলী। ধার্যকৃত সময় অনুযায়ী গত ২৮ জুন রাত ১০টায় গোগা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ আলীর বাসভবনে নগদ ৩ লাখ টাকা বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

ভুক্তভোগী জানান, অর্থ হস্তান্তরের সময় স্থানীয় আশরাফ, কাশেম, মতি ও কাদের মোল্লা উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে বিএনপি সভাপতি মোহাম্মদ আলী জামিনদার এরশাদ আলীকে ২০ হাজার টাকা ফেরত দেন গোলাম হোসেনকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য।

ভুক্তভোগী গোলাম হোসেনের স্ত্রী সাফিয়া খাতুন জানান, "সাথী আমাদের নিজ গোষ্ঠীর ছেলের বউ (সম্পর্কে পুত্রবধূ)। সে প্রায়ই শ্বশুরের কাছে পান খেতে আসে। সেদিনও ঘরে ঢুকে ‘বড় আব্বা পান দাও’ বলে। আমি বাইরে থাকার সুযোগে প্রতিবেশি কয়েকজন এসে তাদের জিম্মি করে এবং অনৈতিক কাজের অপবাদ দিয়ে ৩ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করে। আমার স্বামী বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন, ঠিকমতো চলতেও পারেন না। লোকলজ্জার ভয়ে শেষ সম্বল ৭ কাঠা জমি বিক্রি করে জরিমানা শোধ করেছি। এখন আমাদের আর কিছুই রইল না।"

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ঘটনার পর একটি স্বার্থান্বেষী মহল ভয়ভীতি দেখিয়ে সাথীকে তাঁর বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে ভুক্তভোগী গোলাম হোসেন বলেন, *"লোকলজ্জা ও সামাজিক অপমানের ভয়ে জমি বিক্রি করে টাকা দিতে বাধ্য হয়েছি। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি মানসিকভাবে মারাত্মক বিপর্যস্ত।" তিনি নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে সুবিচারের জন্য যশোর জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

কথিত ভিকটিম সাথীর শাশুড়ি আনিছা খাতুন জানান, তাঁর পুত্রবধূ প্রায়ই ভাসুর গোলাম হোসেনের বাড়িতে যেতেন। সালিশের পর বউমা কিশোরগঞ্জে বাবার বাড়িতে বেড়াতে গেছেন।

জরিমানার টাকার বিষয়ে তিনি বলেন, "সালিশের জরিমানার ৩ লাখ টাকা আমরা বা আমাদের পরিবার পাইনি। তবে হুজুর বলেছেন, আমাদের জন্য ১ লাখ টাকা তাঁর কাছে রাখা আছে, যা পরবর্তীতে ছেলের নামে ব্যাংকে জমা করে দেওয়া হবে।"

ঘটনার বিষয়ে গোগা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "গোলাম হোসেন আমার গোষ্ঠীর বড় ভাই। তিনি সাথীকে ৪০০ টাকার লোভ দেখিয়ে ঘরে নিয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের চেষ্টা করেন। বিষয়টি জানাজানি হলে লোকলজ্জার ভয়ে দ্রুত সমাধানের জন্য গ্রামে সালিশ বৈঠক হয়। সেখানে গোলাম হোসেন নিজের দোষ স্বীকার করেন। পরবর্তীতে সালিশ কমিটি ভিকটিমের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ৩ লাখ টাকা জরিমানা নির্ধারণ করে। তবে জরিমানার টাকা আমি নিজে হাতে গ্রহণ বা হস্তান্তর করিনি।"

শেয়ার করুন