ঢাকা, বাংলাদেশ || বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক

লাইব্রেরি সহকারী থেকে চীনের বিপ্লবী নেতা মাও জেদং

প্রতিনিধি

সীমান্তের খবর ডেস্ক:

৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
লাইব্রেরি সহকারী থেকে চীনের বিপ্লবী নেতা মাও জেদং

লাইব্রেরি সহকারী থেকে চীনের বিপ্লবী নেতা মাও জেদং

একসময় পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে সহকারী হিসেবে কাজ করতেন তিনি। বই পড়া, রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে ভাবনা এবং দেশের মানুষের দুর্দশা তাঁকে ক্রমেই রাজনীতির দিকে টেনে নেয়। সেই সাধারণ গ্রন্থাগার সহকারীই একসময় হয়ে ওঠেন চীনের কমিউনিস্ট বিপ্লবের প্রধান নেতা এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠাতা মাও জেদং।

১৮৯৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর মধ্য চীনের হুনান প্রদেশের শাওশান এলাকায় এক কৃষক পরিবারে জন্ম মাও জেদংয়ের। তাঁর জন্মের সময় চীনে চিং বা কিং রাজবংশের শাসন চলছিল। কিন্তু সাম্রাজ্যটি তখন নানা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে জর্জরিত। সাধারণ মানুষের জীবন ছিল দুর্বিষহ। যদিও মাওয়ের পরিবার আশপাশের অনেক কৃষক পরিবারের তুলনায় স্বচ্ছল ছিল।

১৯১১ সালের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে চীনের রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং দেশটি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। কিন্তু রাজতন্ত্রের অবসান চীনে স্থিতিশীলতা আনতে পারেনি। দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকার, আঞ্চলিক যুদ্ধবাজদের আধিপত্য এবং রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে দেশটি দীর্ঘদিন বিভক্ত ও অস্থিতিশীল অবস্থায় ছিল।

এই অস্থিরতার মধ্যেই ধীরে ধীরে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন তরুণ মাও।

সমাজের বৈষম্য নাড়া দেয় মাওকে

চীনের গ্রামীণ মানুষের দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্য মাওয়ের চিন্তাজগতে বড় প্রভাব ফেলে। বন্যা, দুর্ভিক্ষ, রোগ ও সংঘাতের কারণে বিভিন্ন সময়ে চীনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। খাদ্যের অভাবে মানুষ অনাহারে মারা যাচ্ছিল। চরম দারিদ্র্যের কারণে কোথাও কোথাও পরিবারগুলো সন্তান বিক্রি করতেও বাধ্য হয়েছিল।

মাওয়ের শৈশবের কিছু অভিজ্ঞতাও তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাকে প্রভাবিত করে। নিজের এলাকায় বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নের ঘটনা তাঁকে দীর্ঘদিন নাড়া দিয়েছিল।

নারীর অধিকার ও প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতিও তাঁর আগ্রহের বিষয় হয়ে ওঠে। ১৯১৯ সালের নভেম্বরে জাও উঝান নামের এক তরুণীর আত্মহত্যার ঘটনা তাঁকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। পরিবার ও সমাজের চাপে নিজের পছন্দের বাইরে বিয়ে দেওয়ার বিরোধিতা করছিলেন ওই তরুণী। এ ঘটনা নিয়ে মাও একাধিক নিবন্ধ লেখেন।

তখন চীনের তরুণ সমাজের একটি অংশ প্রচলিত বিবাহব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছিল। নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতা, শিক্ষা ও সামাজিক অধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

গ্রন্থাগার থেকে মার্ক্সবাদের পথে

শিক্ষাজীবনের একটি পর্যায় শেষে মাও পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রন্থাগার সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। সময়টি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার সময় তিনি বিপুলসংখ্যক রাজনৈতিক ও সমাজতান্ত্রিক সাহিত্য পড়ার সুযোগ পান। সেখানে চীনা কমিউনিস্ট আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব লি দাজাওয়ের সঙ্গেও তাঁর পরিচয় হয়। লি দাজাও ছিলেন পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাকালীন নেতাদের একজন।

তাঁর সংস্পর্শে এসে মাও মার্ক্সবাদী চিন্তার প্রতি আরও আকৃষ্ট হন। ইউরোপীয় সমাজতান্ত্রিক চিন্তা, মার্ক্সবাদ এবং পরবর্তীতে লেনিনবাদ তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে গভীর প্রভাব ফেলে।

১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবও তরুণ মাওকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। তিনি মনে করতে শুরু করেন, চীনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে একটি মৌলিক বিপ্লব প্রয়োজন।

তবে মাওয়ের বিপ্লবী চিন্তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ছিল। ইউরোপের শিল্পশ্রমিকদের পরিবর্তে তিনি চীনের বিশাল কৃষক জনগোষ্ঠীকে বিপ্লবের প্রধান শক্তি হিসেবে দেখতে শুরু করেন।

কৃষকদের সংগঠিত করার উদ্যোগ

মার্ক্সবাদী চিন্তার সঙ্গে পরিচয়ের পর মাও কৃষকদের সংগঠিত করার দিকে মনোযোগ দেন। হুনানে তিনি কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং পরে সশস্ত্র বিপ্লবের পথেও এগিয়ে যান।

১৯২১ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি বা সিসিপি প্রতিষ্ঠিত হয়। মাও ছিলেন দলটির প্রাথমিক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের একজন। সে সময় চীনের রাজনীতিতে কমিউনিস্ট পার্টির শক্তি খুব সীমিত ছিল।

হুনানে দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার পাশাপাশি মাও একটি কমিউনিস্ট অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত হন। সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা গ্রামাঞ্চলে ঘাঁটি গড়ে তোলার কৌশল গ্রহণ করেন।

দুর্গম গ্রামীণ এলাকায় কমিউনিস্ট ছিটমহল গড়ে তুলে কৃষকদের সংগঠিত করা এবং সশস্ত্র বাহিনী তৈরির মাধ্যমে মাও ধীরে ধীরে নিজের প্রভাব বাড়াতে থাকেন।

কুওমিনতাংয়ের সঙ্গে জোট ও বিচ্ছেদ

১৯২৩ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ও জাতীয়তাবাদী দল কুওমিনতাং বা কেএমটির মধ্যে সহযোগিতা গড়ে ওঠে। চীনের বিভিন্ন অঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী যুদ্ধবাজদের বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশকে ঐক্যবদ্ধ করাই ছিল তাদের অন্যতম লক্ষ্য।

কিন্তু এই রাজনৈতিক জোট বেশিদিন টেকেনি।

১৯২৭ সালে কেএমটির নেতা চিয়াং কাই-শেক কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দমন অভিযান শুরু করেন। হাজার হাজার কমিউনিস্ট ও তাদের সমর্থক নিহত হন। মাওয়ের ঘনিষ্ঠজন ও পরিবারের কয়েকজন সদস্যও এই দমন-পীড়নের শিকার হন।

এই সময় কমিউনিস্টরা শহরকেন্দ্রিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে গ্রামাঞ্চলে নিজেদের শক্ত ঘাঁটি তৈরির দিকে মনোযোগ দেয়।

মাও এবং তাঁর সহযোগীরা সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ১৯২৭ সালের আগস্টে নানচাং বিদ্রোহের মাধ্যমে কমিউনিস্ট সশস্ত্র সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে রেড আর্মি বা কমিউনিস্ট সামরিক বাহিনী আরও সংগঠিত হয়ে ওঠে।

‘লং মার্চ’ ও মাওয়ের উত্থান

কুওমিনতাং বাহিনী কমিউনিস্ট ঘাঁটিগুলোর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সামরিক অভিযান চালাতে থাকে। ১৯৩৪ সালে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়লে কমিউনিস্ট বাহিনী তাদের ঘাঁটি ছেড়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ইতিহাসে এই অভিযান ‘লং মার্চ’ নামে পরিচিত।

প্রায় ছয় হাজার মাইলের এই বিপদসংকুল যাত্রায় কমিউনিস্ট যোদ্ধাদের তুষারঢাকা পাহাড়, দুর্গম জলাভূমি, নদী ও মরুভূমির মতো কঠিন ভূখণ্ড অতিক্রম করতে হয়।

ক্ষুধা, রোগ, শীত এবং সামরিক আক্রমণে বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা যান। বিভিন্ন বর্ণনায় লং মার্চে অংশ নেওয়া বাহিনীর মাত্র একটি ছোট অংশ শেষ পর্যন্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে। প্রচলিত একটি হিসাব অনুযায়ী প্রায় আট হাজার যোদ্ধা শেষ পর্যন্ত উত্তর-পশ্চিম চীনের এলাকায় পৌঁছান।

ইয়ানআন পরবর্তী সময়ে কমিউনিস্টদের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিতে পরিণত হয়। লং মার্চ সামরিকভাবে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা হলেও রাজনৈতিকভাবে এটি মাওয়ের নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করে।

জাপানি আগ্রাসনে বদলে গেল পরিস্থিতি

ঠিক এই সময় চীনের রাজনীতিতে নতুন সংকট তৈরি হয়। ১৯৩৭ সালে জাপান চীনে পূর্ণমাত্রায় সামরিক আগ্রাসন শুরু করে। জাপানের লক্ষ্য ছিল চীনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করা।

জাপানি বাহিনীর আগ্রাসনে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। ১৯৩৭ সালের ডিসেম্বরে নানজিং দখলের পর ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। বিভিন্ন গবেষণা ও ঐতিহাসিক বর্ণনায় নানজিংয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে কুওমিনতাং ও কমিউনিস্টরা আবারও সাময়িকভাবে সহযোগিতায় যায়।

এই সময় মাও ইয়ানআনের বাইরে গুহায় বসবাস করতেন। বিদেশি সাংবাদিক, লেখক ও পর্যবেক্ষকরা সেখানে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

চীনা দার্শনিক ও সমাজ সংস্কারক লিয়াং শুমিন তাঁদের মধ্যে একজন। তাঁর বর্ণনায় মাও ছিলেন স্বাভাবিক, উষ্ণ হৃদয়ের এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী। তবে মাওয়ের রাজনৈতিক চিন্তার সঙ্গে তাঁর মতপার্থক্যও ছিল।

তবু দুজনেই চীনের দুটি বড় সমস্যা নিয়ে একমত ছিলেন-গ্রামীণ দারিদ্র্য এবং জাপানি আগ্রাসন থেকে জাতীয় মুক্তি।

মাও এক পর্যায়ে তাঁকে বলেছিলেন, ‘যুদ্ধ সবকিছু বদলে দিয়েছে।’

ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ও চীন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রানা মিত্তার বিবিসিকে বলেন, যুদ্ধকালীন সংঘাতে চীনে ১৪ মিলিয়ন বা তারও বেশি বেসামরিক ও সামরিক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে বিভিন্ন হিসাবে উঠে আসে। একই সময়ে প্রায় আট থেকে ১০ কোটি মানুষ নিজেদের দেশেই বাস্তুচ্যুত বা শরণার্থীতে পরিণত হয়েছিলেন।

এই যুদ্ধ চীনের রাজনীতি ও সমাজকে গভীরভাবে বদলে দেয়।

গৃহযুদ্ধে কমিউনিস্টদের জয়

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে কুওমিনতাং ও কমিউনিস্টদের মধ্যকার সাময়িক ঐক্য আবার ভেঙে যায়। শুরু হয় নতুন করে গৃহযুদ্ধ।

কুওমিনতাং যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা পায়। কমিউনিস্টরা সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকেও সহযোগিতা পায়।

অস্ত্র ও সামরিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে কমিউনিস্টরা শুরুতে পিছিয়ে থাকলেও গ্রামাঞ্চলে তাদের শক্তিশালী সংগঠন ছিল। ইয়ানআনে দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালিত ভূমি সংস্কার কর্মসূচি কৃষকদের মধ্যে সমর্থন তৈরি করেছিল।

সামাজিক ন্যায়বিচার ও ভূমির মালিকানা পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি কমিউনিস্টদের জনপ্রিয়তা বাড়ায়। শেষ পর্যন্ত গৃহযুদ্ধের মোড় তাদের পক্ষে চলে যায়।

১৯৪৯ সালে কুওমিনতাং বাহিনী পরাজিত হয় এবং চীনের মূল ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নেয় কমিউনিস্টরা।

গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের জন্ম

১৯৪৯ সালের ১ অক্টোবর বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন গেটে দাঁড়িয়ে মাও জেদং গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন।

অন্যদিকে কুওমিনতাং নেতা চিয়াং কাই-শেক ও তাঁর অনুসারীরা তাইওয়ানে চলে যান।

চীনা সাম্রাজ্যের পতনের কয়েক দশক পর, জাপানি আগ্রাসন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের ভয়াবহতা পেরিয়ে চীনের সামনে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়।

কিন্তু সেই নতুন রাষ্ট্রের সামনে ছিল বিশাল অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ।

সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি

ক্ষমতায় এসে মাও চীনের অর্থনীতি ও সমাজকে দ্রুত বদলে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। শিল্পকারখানা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। কৃষকদের সমবায়ভিত্তিক কৃষিকাজে যুক্ত করা হয়।

মাওয়ের রাজনৈতিক দর্শন ‘মাওবাদ’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। এটি মূলত মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের সঙ্গে চীনের কৃষিভিত্তিক বাস্তবতাকে যুক্ত করে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক চিন্তাধারা।

তবে রাজনৈতিক বিরোধিতা কঠোরভাবে দমন করা হয়। রাষ্ট্র ও কমিউনিস্ট পার্টির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করা হয়।

‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ এবং দুর্ভিক্ষ

১৯৫৮ সালে মাও ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ বা ‘মহা অগ্রযাত্রা’ কর্মসূচি গ্রহণ করেন। এর লক্ষ্য ছিল কৃষি ও শিল্প উৎপাদন দ্রুত বাড়িয়ে চীনকে অল্প সময়ের মধ্যে শক্তিশালী শিল্পরাষ্ট্রে পরিণত করা।

লক্ষ্য পূরণে বিপুলসংখ্যক মানুষকে উৎপাদন কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হয়। গ্রামীণ এলাকায় সমবায় ও কমিউন ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়।

কিন্তু বাস্তবে পরিকল্পনাটি ভয়াবহ ব্যর্থতায় পরিণত হয়। উৎপাদন ব্যবস্থার নানা সমস্যা, ভুল নীতি, অতিরঞ্জিত উৎপাদন-তথ্য এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যায়।

এর সঙ্গে খারাপ ফলন যুক্ত হয়ে চীনে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।

এই দুর্ভিক্ষে কত মানুষ মারা গিয়েছিলেন, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে বিভিন্ন গবেষণায় মৃত্যুর সংখ্যা কয়েক কোটি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বহুল উদ্ধৃত হিসাবগুলোর মধ্যে তিন কোটির বেশি মৃত্যুর কথাও রয়েছে।

এই বিপর্যয়ের পর মাওয়ের রাজনৈতিক প্রভাব কিছুটা কমে যায় এবং দলের অন্য নেতারা অর্থনৈতিক নীতি পরিচালনায় বেশি ভূমিকা নিতে শুরু করেন।

ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’

নিজের রাজনৈতিক অবস্থান পুনরুদ্ধার এবং কমিউনিস্ট পার্টি ও সমাজ থেকে কথিত ‘বুর্জোয়া’ ও পুরোনো চিন্তার প্রভাব দূর করার লক্ষ্যে মাও ১৯৬৬ সালের ১৬ মে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা করেন।

তাঁর লক্ষ্য ছিল মানুষের চিন্তা, সংস্কৃতি ও জীবনযাপনে বিপ্লব ঘটানো। পুরোনো মূল্যবোধ, রীতিনীতি, সংস্কৃতি ও চিন্তাধারাকে তিনি কমিউনিস্ট বিপ্লবের পথে বাধা হিসেবে দেখেছিলেন।

এই আন্দোলনের প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে বিপুলসংখ্যক তরুণ। তাদের সংগঠিত করে গড়ে তোলা হয় ‘রেড গার্ড’ বা লাল বাহিনী।

রেড গার্ডের তাণ্ডব

রেড গার্ডের সদস্যরা সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। বিশেষ করে শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, কর্মকর্তা, ভূস্বামী ও রাজনৈতিকভাবে সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা নির্যাতনের শিকার হন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। শিক্ষক ও অধ্যাপকদের প্রকাশ্যে অপমান করা, গালাগালি করা, শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা এবং তাঁদের কাছ থেকে কথিত ভুল স্বীকার করানোর ঘটনা ঘটে।

কাউকে মাথা কামিয়ে দেওয়া হতো, কাউকে অপমানজনক পোশাক পরানো হতো। অনেককে শারীরিক নির্যাতনও করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে নির্যাতনের ফলে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে।

চীনের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি, স্থাপনা, বই ও শিল্পকর্মের ওপরও আক্রমণ চালানো হয়। পুরোনো চিন্তা ও সংস্কৃতি ধ্বংস করার নামে দেশের বিশাল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় অংশ নেওয়া রেড গার্ড সদস্য সো ইয়ং পরে বিবিসিকে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এক পর্যায়ে তিনি উপলব্ধি করতে শুরু করেন যে পরিস্থিতি আর মাওয়ের নিয়ন্ত্রণে নেই।

১৯৬৪ সালে প্রকাশিত মাওয়ের উদ্ধৃতিসংকলন ‘লিটল রেড বুক’ এই সময় বিশেষ গুরুত্ব পায়। বিপ্লবী তরুণদের মধ্যে এটি প্রায় অবশ্যপাঠ্য রাজনৈতিক বইয়ে পরিণত হয়।

মাও প্রথমে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মাধ্যমে পার্টিকে ‘শুদ্ধ’ করতে চাইলেও এক পর্যায়ে রেড গার্ডদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে।

বিভিন্ন গবেষণায় সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় প্রায় ১৫ লাখ মানুষের মৃত্যুর হিসাব পাওয়া যায়। তবে এ সংখ্যা নিয়েও ঐতিহাসিক গবেষণায় মতপার্থক্য রয়েছে।

দলের ভেতরেও ব্যাপক পরিবর্তন

সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুধু সাধারণ মানুষ বা বুদ্ধিজীবীদের ওপর প্রভাব ফেলেনি; কমিউনিস্ট পার্টির ভেতরেও ব্যাপক ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে।

পার্টির প্রেসিডেন্ট লিউ শাওছি ক্ষমতা হারান এবং পরে একাকী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।

মাওয়ের উত্তরসূরি হিসেবে একসময় বিবেচিত মার্শাল লিন বিয়াওয়ের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ১৯৭১ সালে লিন বিয়াও চীন থেকে পালানোর সময় বিমান দুর্ঘটনায় মঙ্গোলিয়ায় নিহত হন।

মাওয়ের স্ত্রী জিয়াং ছিং এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহযোগী পরবর্তী সময়ে ‘গ্যাং অব ফোর’ নামে পরিচিত হন। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের শেষ পর্যায়ে তাঁরা চীনের রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৬৭ সালের দিকে বিভিন্ন শহরে পরিস্থিতি প্রায় নৈরাজ্যের পর্যায়ে পৌঁছালে মাও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করেন।

এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে রেড গার্ডদের প্রভাব কমানো হয় এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা শুরু হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায়

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ক্ষত ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও জীবনের শেষদিকে মাও চীনের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন কৌশল গ্রহণ করেন।

যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

১৯৭২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ঐতিহাসিক চীন সফর করেন। তিনি মাও জেদংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দীর্ঘদিনের বৈরিতার পর চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে এই সফর ছিল গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার

শারীরিক অবস্থার অবনতি সত্ত্বেও জীবনের শেষ পর্যন্ত চীনের রাজনীতিতে মাওয়ের প্রভাব ছিল ব্যাপক।

১৯৭৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মাও জেদং মৃত্যুবরণ করেন।

একজন কৃষক পরিবারের সন্তান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার সহকারী, সেখান থেকে বিপ্লবী সংগঠক এবং শেষ পর্যন্ত একটি বিশাল দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছানোর গল্প মাও জেদংয়ের।

তাঁর নেতৃত্বে চীনা কমিউনিস্টরা দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে জয়ী হয়ে ১৯৪৯ সালে একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। ভূমি সংস্কার, শিল্পের রাষ্ট্রীয়করণ ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি গড়ে তোলার মতো বড় পরিবর্তনও তাঁর শাসনামলে ঘটে।

কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার একই সঙ্গে গভীর বিতর্কে ঘেরা। ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’-এর দুর্ভিক্ষে কয়েক কোটি মানুষের মৃত্যু, সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় ব্যাপক নিপীড়ন ও প্রাণহানি এবং চীনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ক্ষতি তাঁর শাসনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর মধ্যে পড়ে।

চীনের বাইরেও তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মাওবাদী আন্দোলনের বিকাশ ঘটে। ভারত, নেপাল ও ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশে মাওবাদী সংগঠন সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে দীর্ঘদিন আন্দোলন করেছে।

তাই মাও জেদংকে শুধু একজন কমিউনিস্ট নেতা হিসেবে দেখলে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না। তিনি ছিলেন একই সঙ্গে বিপ্লবী, রাষ্ট্রনায়ক, রাজনৈতিক তাত্ত্বিক এবং বিতর্কিত শাসক—যাঁর সিদ্ধান্ত চীনের কোটি কোটি মানুষের জীবন এবং বিশ্বের রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে।

একজন সাধারণ লাইব্রেরি সহকারী কীভাবে একটি বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্বের অন্যতম জনবহুল দেশের প্রতিষ্ঠাতা নেতায় পরিণত হলেন-মাও জেদংয়ের জীবন সেই দীর্ঘ ও রক্তাক্ত রাজনৈতিক যাত্রারই ইতিহাস।

তথ্যচিত্র: বিবিসি বাংলা

শেয়ার করুন

লাইব্রেরি সহকারী থেকে চীনের বিপ্লবী নেতা মাও জেদং | সীমান্তের খবর