তেল সংকটের আশঙ্কা: ১৯৭০-এর দশকের অভিজ্ঞতা কি আবারও ফিরে আসছে?
প্রতিনিধি
সীমান্তের খবর ডেস্ক :

আরব তেল উৎপাদকেরা ১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে ব্যাপক সংকট দেখা দেয় জ্বালানি তেলের, ১৯৭৪ সালে জার্মানির রাস্তায়
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় ধরে কার্যত অচল হয়ে পড়ায় নতুন করে বৈশ্বিক তেল সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
নৌপরিবহন বিশ্লেষক এবং মায়ের্সকের সাবেক কর্মকর্তা লার্স জেনসেন বলেন, ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় গভীর প্রভাব ফেলছে এবং এর অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া অতীতের বড় সংকটগুলোকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) পরিচালক ফাতিহ বিরোল। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতি “ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির” একটি উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট: কী হয়েছিল?
বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘোরানো ঘটনা। ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে ইয়োম কিপুর যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আরব তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো ইসরায়েলকে সমর্থনকারী যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর তেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক পদক্ষেপ। শুধু নিষেধাজ্ঞাই নয়, ওই সময় ইচ্ছাকৃতভাবে তেল উৎপাদনও কমিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে অল্প সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় চারগুণ বেড়ে যায়।
এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দেয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ শিল্পোন্নত দেশগুলোতে জ্বালানি রেশনিং চালু হয়। গাড়ি চালানোর দিন নির্ধারণ, পেট্রোলের সীমিত সরবরাহ, এমনকি বিদ্যুৎ ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ—এসব পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয় সরকারগুলো।
উচ্চ জ্বালানি খরচ উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়, ফলে পণ্যের দাম বেড়ে যায় এবং মুদ্রাস্ফীতি তীব্র আকার ধারণ করে। একই সঙ্গে শিল্পখাতে উৎপাদন কমে যায়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যয় সংকোচন করে এবং বেকারত্ব দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
এই পরিস্থিতি “স্ট্যাগফ্লেশন” নামে পরিচিত এক জটিল অর্থনৈতিক অবস্থার সৃষ্টি করে—যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যায় কিন্তু মূল্যস্ফীতি বাড়তেই থাকে। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে মন্দা চলে এবং সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে থাকে। ধর্মঘট, বিক্ষোভ এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধি পায়, যা রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রভাব ফেলে।
বর্তমান পরিস্থিতি: কী ঘটছে এখন?
বর্তমান সংকটের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন করে বাড়তে থাকা সংঘাত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এ পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে তেল, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্যের সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে যে তেল বিশ্ববাজারে পৌঁছাচ্ছে, তা মূলত আগেই পাঠানো চালান। কিন্তু এই প্রবাহ দ্রুতই কমে আসবে। এমনকি যদি খুব দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়, তবুও বাজারে এর প্রভাব কয়েক মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত থাকতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সামরিক ও কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। তবে উত্তেজনা কমার স্পষ্ট লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
১৯৭০-এর দশকের সঙ্গে পার্থক্য কোথায়?
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি ১৯৭০-এর দশকের সংকটের মতো হলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। এখন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার অনেক বেশি বহুমুখী। তেলের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং বিকল্প উৎসের ব্যবহার বেড়েছে।
এছাড়া অনেক দেশের কাছে জরুরি তেল মজুত রয়েছে, যা সংকটের সময় কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বাজার ব্যবস্থাপনাও আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে।
তবে উদ্বেগের জায়গা হলো—বর্তমান সংকটের প্রভাব উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বেশি পড়ছে। এসব দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা তুলনামূলক কম, ফলে দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ জ্বালানি মূল্য তাদের জন্য বড় চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ১৯৭০-এর দশকের সংকট মূলত উন্নত দেশগুলোকে কেন্দ্র করে ছিল, যারা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অর্থনীতি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছিল। কিন্তু বর্তমান সংকটে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলো বেশি ঝুঁকির মুখে।
সামনে কী হতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকট কতটা গভীর হবে তা নির্ভর করছে সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয় তার ওপর। যদি দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়বে এবং এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই পড়বে।
তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সংকট এড়াতে সবচেয়ে জরুরি হলো সংঘাত কমানো এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক করা। অন্যথায়, বিশ্ব অর্থনীতি আবারও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
