ভারতে প্রথমবার ‘জিহাদি ড্রাগ’ ক্যাপ্টাগন উদ্ধার, ১৮২ কোটি টাকার চালান জব্দ॥
প্রতিনিধি
সীমান্তের খবর ডেস্ক:

ভারতে প্রথমবারের মতো বিপুল পরিমাণ ‘ক্যাপ্টাগন’ নামের কুখ্যাত মাদক জব্দ হওয়ায় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
ভারতে প্রথমবারের মতো বিপুল পরিমাণ ‘ক্যাপ্টাগন’ নামের কুখ্যাত মাদক জব্দ হওয়ায় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘জিহাদি ড্রাগ’ এবং ‘গরিবের কোকেন’ নামে পরিচিত এই মাদক উদ্ধারের ঘটনাকে ভারতের নিরাপত্তা ও মাদকবিরোধী অভিযানের ক্ষেত্রে বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভারতের মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যুরো (এনসিবি) পরিচালিত বিশেষ অভিযান ‘অপারেশন রেজপিল’-এর আওতায় গুজরাটের মুন্দ্রা বন্দর এবং রাজধানী দিল্লির নেব সরাই এলাকা থেকে প্রায় ১৮২ কোটি রুপি মূল্যের ক্যাপ্টাগনের একটি বড় চালান জব্দ করা হয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটিই ভারতে প্রথমবারের মতো এত বড় পরিসরে ক্যাপ্টাগন উদ্ধার।
ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, মোদি সরকার মাদকমুক্ত ভারত গড়তে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো প্রথমবারের মতো তথাকথিত ‘জিহাদি ড্রাগ’ ক্যাপ্টাগন জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি জানান, এই অভিযানে একজন সিরীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, চালানটি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাচারের উদ্দেশ্যে ভারতে আনা হয়েছিল।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রাথমিক বিশ্লেষণে জানা গেছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান অস্থিরতা ও সংঘাতের প্রেক্ষাপটে মাদকটি যুদ্ধরত গোষ্ঠীগুলোর কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা থাকতে পারে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি, তবু নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ক্যাপ্টাগন দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত।
ক্যাপ্টাগনের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৯৬০-এর দশকে ‘ফেনিথাইলাইন’ নামে এটি চিকিৎসা কাজে ব্যবহার করা হতো। মূলত মনোযোগ ঘাটতি সমস্যা (অ্যাটেনশন ডিসঅর্ডার) এবং নার্কোলেপ্সির মতো রোগের চিকিৎসায় এটি ব্যবহৃত হতো। তবে পরে এর ভয়াবহ আসক্তি ও ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে ১৯৮০-এর দশক থেকে বিভিন্ন দেশে এটি নিষিদ্ধ হতে শুরু করে। পরবর্তীতে জাতিসংঘও এটিকে নিয়ন্ত্রিত সাইকোট্রপিক পদার্থের তালিকাভুক্ত করে।
বর্তমানে কালোবাজারে যে ক্যাপ্টাগন পাওয়া যায়, তা মূল ওষুধটির তুলনায় অনেক বেশি বিপজ্জনক বলে মনে করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক অবৈধ ক্যাপ্টাগন মূলত ল্যাবরেটরিতে তৈরি সিন্থেটিক মাদকের মিশ্রণ, যাতে অ্যাম্ফিটামিন, ক্যাফেইন, মেথামফেটামিনসহ বিভিন্ন উত্তেজক রাসায়নিক থাকে।
এই মাদক ব্যবহার করলে দীর্ঘ সময় জেগে থাকা, ক্লান্তি কম অনুভব করা এবং ভয় বা উদ্বেগ সাময়িকভাবে দমন করার মতো প্রভাব দেখা যায়। এ কারণেই সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ চলাকালে আইএসসহ বিভিন্ন উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে এর ব্যবহার বাড়ে। তখন থেকেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এটি ‘জিহাদি ড্রাগ’ নামে পরিচিতি পায়।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ক্যাপ্টাগনের সামান্য ব্যবহারও অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। এটি মানুষের আচরণে চরম আগ্রাসন, সহিংসতা, অস্বাভাবিক আত্মবিশ্বাস এবং হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা তৈরি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি মানসিক ভারসাম্যহীনতা, উদ্বেগ, হ্যালুসিনেশন এবং স্থায়ী মানসিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
ভারতের নিরাপত্তা ও মাদকবিরোধী সংস্থাগুলো মনে করছে, এই চালান জব্দের মাধ্যমে একটি বড় আন্তর্জাতিক মাদকপাচার চক্রের কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া গেছে। ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও গ্রেপ্তার ও নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
